 |
| টেগর লজ |
সমগ্র কুষ্টিয়া জেলাটাই যেনো প্রত্ন সম্পদের আধার। এ জেলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। ইতিহাসের প্রতি টান থেকে আমি ছুটে এসেছি কুষ্টিয়ে জেলায়। ঘুরে বেড়াচ্ছি কুষ্টিয়া জেলার বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন গুলো। আমার আজকের গন্তব্য কুষ্টিয়া সদর উপজেলার মিলপাড়া নামক এলাকায় অবস্থিত আমাদের বাংলার গৌরব বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুষ্টিয়া কুঠিবাড়ি বা টেগর লজ।
জলযোগ সেরে খুব ভোরেই আমি বেড়িয়ে পড়ি মিলপাড়া নামক এলাকার উদ্দেশ্যে। অত্র এলাকাটির নাম মিল পাড়া হওয়ার কারণ এক সময় উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ কাপড়ের মিল মোহিনী মিল যা এখানেই অবস্থিত। মোহিনী মিল নিয়ে অন্য একটি লেখায় বিস্তারিত ইতিহাস তুলে ধরবো। তো মিলপাড়া নামক এলাকায় আসতেই আমাদের নজরে পড়লো দ্বিতল বিশিষ্ট লাল রঙা ভবনটি।
ইতিহাস থেকে জানা যায় জমিদারি পরিচালনায় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৮৯ সালে কুষ্টিয়ার শিলাদহে আসেন। ১৯০১ সাল পর্যন্ত কবি থেকেছেন শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে। জমিদারি পরিচালনার পাশাপাশি কুষ্টিয়া শহরের মিলপাড়ার এই ‘টেগর লজ’ থেকে কবি ব্যবসা পরিচালনা করতেন। ওই সময় টেগর এন্ড কোং নামে তিনি একটি কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন করেন।
ভুসিমালের কারবারের সঙ্গে এখানে কবি আখ মাড়াইকল ও পাটের গাঁট তৈরির কলও স্থাপন করেছিলেন। পরে স্বদেশি আন্দোলনের চেতনায় টেগর লজকে কেন্দ্র করে একটি বড় তাঁতশালাও গড়ে তোলেন। কবিকে ব্যবসার কাজে সাহায্য করতেন তার দুই ভ্রাতুষ্পুত্র সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রথমদিকে ব্যবসা ভালো চললেও পরে টেগর অ্যান্ড কোম্পানি ক্রমাগত লোকসান দিতে থাকে। পাটের কারবার করতে এসে কবি লাখ টাকার ওপরে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। উপায়ান্তর না দেখে তিনি শ্বশুরবাড়ি খুলনার দক্ষিণডিহির উদ্যমী যুবক যজ্ঞেশ্বরকে ব্যবসা দেখভালের দায়িত্ব দেন। যজ্ঞেশ্বর বহু খেটেখুটে ডুবতে বসা টেগর অ্যান্ড কোম্পানিকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চালাতে থাকেন।
একপর্যায়ে কবি তিন হাজার টাকায় যজ্ঞেশ্বরকে কোম্পানির সমুদয় যন্ত্রপাতি ও মালামাল দান করে দেন এবং ‘টেগর লজ’সহ এখানকার দুই বিঘা জমি বছরে ৫০ টাকা খাজনার বিনিময়ে বন্দোবস্ত করে দেন। পরে যজ্ঞেশ্বর এখানে ‘যজ্ঞেশ্বর ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস’ নামে একটি কারখানা গড়ে তোলেন (কারখানা ভবনটি এখনো আছে)।
কোলকাতা থেকে শিলাইদহে যাওয়ার সময় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘টেগর লজে’ বিশ্রাম নিতেন। বিশ্রাম গ্রহণের পর নৌপথ কিংবা পালকিযোগে কবি যেতেন শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে। দেশ বিভাগ ও পরে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর কুঠিবাড়িসহ অন্য সম্পত্তি সরকারি নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু ‘টেগর লজটি’ নানা জনের হাত বদলের পরিক্রমায় বেদখল হয়ে যায়। সর্বশেষ ১৯৮০ সালে কুষ্টিয়ার মিলপাড়ার ছালেমা খাতুন নামের এক গৃহবধু কাগজ-পত্র প্রস্তুত ও কারসাজির মাধ্যমে বাড়িটি নিজ নামে রেজিস্ট্রি করে নেন। পরে ২০০১ সালে এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দিক বেদখল হওয়া ঐতিহ্যমন্ডিত এ বাড়িটি পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
কুষ্টিয়া পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান খন্দকার ইসরাইল হোসেন আফুকে আহ্বায়ক ও লালন একাডেমির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক তাইজাল আলী খানকে সদস্য সচিব করে গঠিত পুনরুদ্ধার কমিটির প্রচেষ্টায় সমঝোতার ভিত্তিতে বাড়িটির মালিকানা দাবিদার সালেমা খাতুনকে সাত লাখ টাকা পরিশোধ সাপেক্ষে ২০০২ সালে ‘টেগর লজ’ দলিলমূলে কুষ্টিয়া পৌরসভার নামে রেজিস্ট্রি করা হয়। কিন্তু সুদীর্ঘ দেড় যুগ পরও পৌরসভা কর্তৃপক্ষ ‘টেগর লজ’ ঘিরে মিউজিয়াম ও সংগ্রহশালা রূপান্তরে সফল হতে পারেনি।
পরে ২০১৭ সালে ১২ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে পুরার্কীতি হিসাবে ‘টেগর লজ’ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অনুকুলে সরকারি গেজেট প্রকাশিত হয়। কিন্তু কুষ্টিয়া পৌরসভার বর্তমান মেয়র আনোয়ার আলী ‘টেগর লজ’ হস্তান্তরে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ডিজিকে আপত্তি জানিয়ে পত্র দেয়। ফলে সরকারি গেজেটভুক্তির পরও ‘টেগর লজ’ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর হস্তান্তর পাচ্ছে না।
কবি যখন ট্রেনে কলকাতা থেকে আসতেন বা কলকাতা যেতেন, তখন শিলাইদহ যাতায়াতের সময় টেগর লজে বিশ্রাম নিতেন। অনেক সময় রাতযাপনও করেছেন। ব্যবসায়িক কাজের তদারক করেছেন এখানে থেকেই।
তিনি কুষ্টিয়া রেলস্টেশন সংলগ্ন বসন্তের ফুলে ভরা একটি কুরচি গাছ নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন। ‘১০ বৈশাখ ১৩৩৪-এ লেখা ‘কুরচি’ নামে এ কবিতা পরে বনবাণী বইয়ে গ্রথিত হয়।’ পদ্মা-গড়াই-হিশনার শীতল স্রোতে প্লাবিত এই অঞ্চল। এখানকার জনপদের ইতিহাস এক নদীর মতোই উদার, মহান ও বিশালতাই পূর্ণ। রবীন্দ্রনাথ এখানে এসেছিলেন প্রথমে জমিদারি ও ব্যবসা দেখাশোনা করার কাজে। পরে মিশে গিয়েছিলেন এখানকার প্রতিটি মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গে। তার প্রতিটি লেখায় মূর্ত হয়ে উঠেছে এখানকার মানুষের কথা। হয়ত কুষ্টিয়ার অকৃত্রিমতাই মুগ্ধ হয়ে কবি গেয়ে উঠেছিলেন ‘আকাশ ভরা সূর্যতারা, বিশ্ব ভরা প্রাণ/তাহারি মাঝখানে, আমি পেয়েছি মোর স্থান/ বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান’।
শুধু জমিদারিত্বই নয়, এ স্থানটি ছিল রবি ঠাকুরের সাহিত্য সৃষ্টির এক অপূর্ব প্রেরণা। এখানে বসেই তিনি রচনা করেন মানসী, সোনারতরী, চিত্রা, বলাকা, ক্ষণিকা, নৈবদ্য প্রভৃতি কবিতা। তার অনবদ্য সৃষ্টি গল্পগুচ্ছের অধিকাংশ গল্প রচিত হয়েছিল এখানেই। এমনকি গীতাঞ্জলির অধিকাংশ গান সৃষ্টি হয় এ কুষ্টিয়ায়।
১৮৯০ থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ বিচরণ করেছেন তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান টেগর লজে। জমিদারির কাজে কিংবা ব্যবসার কাজে কখনো স্বল্প-কখনো দীর্ঘ সময় থেকেছেন এখানেই। এসেছেন একাকী কিংবা সপরিবারে। ঘুরে বেড়িয়েছেন বোটে, পালকিতে। প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথ কুষ্টিয়াকে কতখানি সমৃদ্ধ করেছিলেন তার লেখাতেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়।
শিল্প-সাহিত্য, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এখানে সে সময় আবির্ভাব ঘটেছিল বড় বড় প্রভাবশালী মহৎ সব ব্যক্তিত্বের। তাই তিনি আবেগভরা কণ্ঠে বলেছিলেন_ ‘ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই, ছোট সে তরী আমারই সোনার ধানে গিয়াছে যে ভরি’। বাঙালি চিরকাল যাদের নিয়ে গর্ব করবে, তাদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অন্যতম। তাই তার স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটির ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি।
লেখক: Rafiq The Explorer