বাংলার ইতিহাসে জমিদারি আমল খুব গুরুত্বপুর্ণ একটি অধ্যায়। ইতিহাস থেকে জানা যায় জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির আগ পর্যন্ত পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশে প্রায় ৩৫০০ জন জমিদার ছিলো। তারই নিদর্শন স্বরুপ আজও বাংলার গ্রামগঞ্জে খুঁজে পাওয়া যায় প্রাচীন অনেক জমিদার বাড়ি। সাভারের বিরুলিয়া জমিদার বাড়িটি তাদের মধ্যে অন্যতম।

ঐতিহাসিক দিক থেকে সাভার খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। ”বংশাবতীর পূর্বতীরে সর্বেশ্বর নগরী বৈসে রাজা হরিশ্চন্দ্র জিনি সুরপুরী।” ছড়াটিতে আমরা বংশাবতী বলতে আজকের বংশী ও সেকালের বংশাবতী নদীকেই বুঝাচ্ছে। যার পূর্বতীরে সর্বেশ্বর নগরী। এই নগরীর রাজা হরিশ্চন্দ্র। এ সময় তাঁর রাজ্য ছিল সুখ শান্তিতে ভরপুর। এই সুখময় রাজ্য সর্বেশ্বর নগরীর অপভ্রংশই আজকের সাভার। আবার কারো কারো মতে ইতিহাস খ্যাত পাল বংশীয় রাজা হরিশ্চন্দ্রের সর্বেশ্বর রাজ্যের রাজধানীর নাম ছিল সম্ভার এবং সম্ভার নাম থেকেই সাভার নামের উৎপত্তি। 

সাভার অতি প্রাচীন স্থলভূমি। ঢাকার ইতিহাসে দেখা যায় ধলেশ্বরী এবং বংশী নদীর সঙ্গম স্থলে বংশী নদীর পূর্বতটে ঢাকা থেকে ১৩ মাইল বায়ু কোনে অবস্থিত সাভার। খৃষ্টীয় অষ্টম শতাব্দী পর্যন্ত এই স্থান সম্ভাগ বা সম্ভাস প্রদেশের রাজধানী ছিল। ঢাকার ধামরাইয়ের উত্তর পশ্চিম কোনে সম্ভাগ নামে যে ক্ষুদ্র পল্লী আছে তা আজো সম্ভাগ প্রদেশের অতীত স্মৃতি বহন করে। বৌদ্ধ নৃপতিগণের শাসনাধীনে প্রাচীন সম্ভাগ তার বিপুল বৈভব ও প্রতাপে পরিপূর্ণ ছিল। সাভার বা সম্ভার নামের পূর্ব কথন বলে অনেক ঐতিহাসিক এই মতের সমর্থন করেন। যেহেতু বৌদ্ধ আমলের অসংখ্য বৌদ্ধ ধ্বংসস্তুপ ও বৌদ্ধ মূর্তি সাভার এলাকার মাটির নিচে আবিস্কৃত হয়েছে এবং আজও হচ্ছে সেহেতু ধরে নেয়া যায় যে বৌদ্ধ শাসনামলে এই শহর গড়ে উঠেছিল। 

গৌতমবুদ্ধ অথবা মৌয্য বংশের শ্রেষ্ঠ সম্রাট আশোকের সময়ও যদি এই রাজ্যের পত্তন হয়ে থাকে তবুও আজকের সাভারের বয়স দুই হাজার দুইশত বছরের অধিক। হরিশচন্দ্র পালই রাজা হরিশচন্দ্র নামে সাভারের সিংহাসনে আরোহণ করেন। রাজা হরিশচন্দ্রের রাজবাড়ী সাভারের পূর্বপাশে রাজাশন গ্রামের অবহেলিত এক কোনে মাটির নিচে চাপা পরে আছে। রাজাশনের আশপাশে লুপ্তপ্রায় বহু দীঘি, বৌদ্ধ স্থাপত্যের নিদর্শন রাজোদ্যান, খাল, পরিখা আজও কালের সাক্ষী হয়ে বিরাজমান। রাজার সেনানিবাস কোঠাবাড়ী সাভারের উত্তর পাশে অবস্থিত। রাজা হরিশ্চন্দ্রের এক রানী কর্ণবতীর নামে কর্ণপাড়া এবং অপর মহিষী ফুলেশ্বরীর নামে রাজফুলবাড়ীয়া সাভারের দক্ষিণে এক মাইল অন্তর অবস্থিত।

ঐতিহাসিক নগরী এই সাভারের সমৃদ্ধ ইতিহাসের অন্যতম আরো একটি নিদর্শন সাভারের বিরুলিয়া জমিদার বাড়ি। তুরাগ নদীর পাড়ে প্রাচীন জনপদ ও ছোট্ট একটি গ্রাম  নাম বিরুলিয়া। বিরুলিয়া ব্রিজের পূর্বপাশে জমিদার রজনীকান্তের সুদৃশ্য বাড়ি, সঙ্গে প্রায় ১১টি প্রাচীন স্থাপনার জন্য বিরুলিয়া বিখ্যাত। তা ছাড়া এখানে রয়েছে বেশ কয়েকটি মন্দির। ঢাকা শহরের কাছেই এমন একটি জায়গায় একদিনে ঘুরে আসার মতো। তুরাগ নদীর পারে বিরুলিয়া সবার  মন কেড়ে নিবে সহজেই।

ঢাকা থেকে খুব কাছের এই গ্রামটির বেশিরভাগ অধিবাসীই হিন্দু ধর্মাবলম্বী। ইতিহাসের সাক্ষী কিংবা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন দেখতে অনেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে গেলেও বিরুলিয়ার ইতিহাস-ঐতিহ্য ও জমিদার বাড়ি গুলো লোকচক্ষুর অন্তরালেই রয়ে গেছে। বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়বে ছড়ানো ছিটানো কালের সাক্ষী হয়ে  এখনও দাঁড়িয়ে থাকা জড়া জীর্ণ বাড়ি গুলো। আছে শতবর্ষী একটি মন্দিরও।

গ্রামের ঠিক শেষ মাথায় নদীর তীর ঘেঁষে বাড়িটি জমিদার রজনীকান্ত ঘোষের। সেখানে এখন বাস করছেন রজনীকান্ত ঘোষের বংশধররা।

স্থানীয় অধিবাসী এবং জমিদারের উত্তরসূরিদের কাছ থেকে জানা গেলো, সেই সময়ের জমিদার নলিনী মোহন সাহার কাছ থেকে রজনীকান্ত ঘোষ ৮৯৬০ টাকা ৪ আনি দিয়ে বাড়িটি কেনেন। পুরানো ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জসহ ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় জমিদার রজনীকান্ত ঘোষের কয়েকটি বাড়ি থাকলেও এখন প্রায় সবগুলোই অন্যদের দখলে। 

১৯৬৪ সালে দাঙ্গার সময় মূল্যবান সব জিনিস লুটপাট হওয়ার পর বিরুলিয়া গ্রামের জমিদার বাড়িটি ছাড়া রজনীকান্তের আর কোনো সম্পত্তি অবশিষ্ট নেই। বিরুলিয়ার অন্যসব পুরোনো বাড়িগুলো পরবর্তী সময়ে একজন ব্যবসায়ী কিনে নিলেও এখন সেগুলোও বেদখল হয়ে গেছে।বাড়িগুলোতে আছে সদরঘর, বিশ্রামঘর, বিচারঘর, পেয়াদাঘর, ঘোড়াশালাসহ উল্ল্যেখযোগ্য আরও কিছু ঘর। তবে এসব এখন অন্য কাজে ব্যবহার হচ্ছে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে বিরুলিয়ার মিরচিনি মুরালির খুব কদর। তাই তো সারা দেশের বিভিন্ন মেলায় সোনারগাঁয়ের পাশাপাশি বিরুলিয়ার এসব পণ্য বিক্রি হতে দেখা যায়।। এছাড়াও বিরুলিয়া থেকে কিছুটা দূরেই সাদুল্লাপুর গ্রামে রয়েছে গোলাপের বাগান। আর তাই সাদুল্লাপুর গোলাপ গ্রাম নামেই সবার কাছে পরিচিত। গোলাপ গ্রামের সুন্দর প্রকৃতি যে কারো মনকে দোলা দিবে। এক দিনেই বিরুলিয়া জমিদার বাড়ি ও গোলাপগ্রাম ঘুরে আসা যাবে।


কিভাবে যাবেন
বিরুলিয়া যাওয়ার কয়েকটি রুট আছে।
রুট ১ - মিরপুর ১ থেকে আলিফ কিংবা মোহনা বাসে উঠে সরাসরি বিরুলিয়া ব্রিজ। তারপর স্থানীয় কাউকে জিজ্ঞেস করে বিরুলিয়া গ্রাম ও জমিদারবাড়ি।

রুট ২ - আব্দুল্লাহপুর/বাইপাইল/আশুলিয়া থেকে প্রথমে বেরিবাধ আসতে হবে। তারপরে মিরপুর ১ গামী যেকোন গাড়িতে উঠে বিরুলিয়া ব্রিজ।

রুট ৩ - সাভার বাসস্ট্যান্ড এ অন্ধমার্কেটের সামনে থেকে লেগুনায় সরাসরি বিরুলিয়া ব্রিজ।

বিরুলিয়া জমিদার বাড়ির আরো কয়েকটি ছবি-

লেখক: Rafiq The Explorer