ভৈরব চন্দ্র সিংহের জমিদার বাড়ি

স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের নিদর্শন বাংলার প্রতি প্রান্তেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেঅধিকাংশ নিদর্শনাবলি আজ হাড়িয়ে যাচ্ছে সভ্যতার আধুনিকতার আড়ালেআবার কিছু কিছু নিদর্শন সংস্কার, আবহেলায়, তার পুরোনো জৌলুশ হাড়িয়ে আপন করে নিয়েছে লতা পাতায় আচ্ছাদিত জড়াজীর্নতাআজ আপনাদেরকে তেমনি একটি ঐতিহাসিক জমিদার বাড়িতে নিয়ে যাবো এবং জানার চেষ্টা করবো বাড়ির ইতিহাস

ভৈরব চন্দ্র সিংহের জমিদার বাড়ি বাংলাদেশ এর কুমিল্লা জেলার চান্দিনা উপজেলার মহিচাইলে অবস্থিত এক ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ি

এই জমিদার বংশের মূল প্রতিষ্ঠাতার নাম জানা যায়নিএই জমিদার বংশের শেষ জমিদার ছিলেন ভৈরব চন্দ্র সিংহতার নামেই উক্ত জমিদার বাড়িটি স্থানীয়দের কাছে বেশ পরিচিত। 

কারণ তিনি ছিলেন প্রজা হিতৈষী জমিদারতার জমিদারী এলাকা চান্দিনা, বরুড়া, দাউদকান্দি ও দেবিদ্বার নিয়ে গঠিত ছিলএখানে এখনো জমিদার বংশধররা বসবাস করতেছেন

কি সুন্দর নকশা করা বাড়িতবে বিভিন্ন সময়ে একটু একটু করে ভেঙ্গেছেতাই তিনতলা জমিদার বাড়ীটি ভেঙ্গে এখন দু’তলায় পরিণত হয়েছেঅযত্ন অবহেলায় পড়ে আছে বাড়িটিবাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলামভেতরে বড় বড় কক্ষছাদে জমে আছে বৃষ্টির পানিসংরক্ষণের অভাবে ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ছে কক্ষের ভেতরেভেতরে প্রবেশ করে দেখি ছোট একটি দরজাভেতরে উঁকি দিয়ে দেখি মাটির নীচে কক্ষের মতো 

যারা ঠিক সময়ে খাজনা আদায় করতে পারতো না তাদেরকে এই কক্ষে আটকে রাখা হতোইংরেজি ইউ আকৃতির বাড়িটিতবে একটি বাড়ির ছাদ থেকে আরেকটি ছাদে যেতে পুলের মতো পথ তৈরি করা হয়েছেকক্ষগুলোতে জমিদারি আমলের চিহ্ন রয়েছে

মূল জমিদার বাড়ির দু’তলায় রয়েছে একটি জলসা ঘরসেখানে নাচ-গান হতোদেয়ালগুলো এখনো সেই স্মৃতি বহণ করে চলছেপ্রতিটি দেয়ালে ছোট ছোট খোপ আছে।। ধারণা করা হচ্ছে, এসবে সরাব রাখা হতোজলসা ঘরের নকশা বেশি আকর্ষণীয়আমরা দেখছি আর মুগ্ধ হচ্ছিজলসা ঘরে অবচেতন মনেই যেন নুপুরের আওয়াজ পেলামকোথাও থেকে যেন বীণার সুর ভেসে এলো কানেদেয়ালে কারুকাজ স্পষ্টএখন সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ চোখে পড়বেতিন তলায় একটি সিংহের মূর্তি ছিলোতিনতলা ক্ষয়ে গেছেতাই এখন আর সিংহের মূর্তিটিও নেই 

বিশাল এলাকাজুড়ে জমিদার ভৈরব সিংহের জমিদারী তালুক ছিলোযার মধ্যে সাচার, চান্দিনা, দেবিদ্বার ও কুমিল্লা শহরের কিছু অংশ অর্ন্তভুক্ত ছিলোযার মধ্যে ছোট বড় মিলিয়ে ৬৪ টি পুকুর ছিলোএছাড়াও জমিদার বাড়ির অদূরে একটি বড় দিঘী রয়েছেওই দিঘী কাটার সময় শ্রমিকরা পাশে একটি ছোট গর্তে কোদাল পরিষ্কার করতোঅনেক শ্রমিক মিলে কোদাল পরিষ্কার করতে করতে ছোট গর্তটি একটি বড়সর পুকুরে পরিণত হয়েছেপুকুরটি এখন কোদাল ধোয়া পুকুর নামে পরিচিত

মহিচাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের জায়গাটি জমিদার ভৈরব সিংহের দেয়াবিদ্যালয়ের সামনে কত বড় মাঠমাধাইয়া থেকে মহিচাইল পর্যন্ত সড়কটি প্রায় ৭ কিঃমি দীর্ঘএই সড়কটিও জমিদার ভৈরব সিংহের তৈরিবাড়ীর পাশের পুকুর পাড়ে রয়েছে জমিদার ভৈরব চন্দ্র সিংহের সমাধিস্থল

তাতে লেখা আছে স্বগীর্য় ভৈরব চন্দ্র সিংহজন্ম ১২৫৯ বঙ্গাব্দ, মৃত্যু ১৩৩৬জমিদার বাড়িতে বেশ কয়েকটি পরিবার বাস করতেন।

তাদের মধ্যে একটি পরিবার ছিলতারা জমিদারদের পঞ্চম প্রজন্ম বলে দাবী করেন। জমিদার ভৈরব সিংহের দুছেলেহরধর চন্দ্র সিংহ ও কামিনি চন্দ্র সিংহজমিদার বাড়ীর প্রবীন মানুষ ক্ষিতিশ চন্দ্র সিংহতিনি ২০১৬ সালে মারা যানধারণা করা হচ্ছে, তিনি জমিদার ভৈরব সিংহের নাতী ছিলেনজমিদার ভৈরব চন্দ্র সিংহ বেশ প্রতাপশালী জমিদার ছিলেনআড়ম্বরপূর্ণ জীবন যাপন ছিলো জমিদার বাড়ীর মানুষজনেরদূরবর্তী যাতায়াতের জন্য জমিদার বাড়ীর পুরুষরা হাতি ও ঘোড়া ব্যবহার করতেননারীদের জন্য পালকি ছিলোজমিদারী প্রথার বিলুপ্তির অনেক বছর পর্যন্ত সেই পালকিটি ছিলো পরে সংরক্ষণের অভাবে পালকিটি নষ্ট হয়ে যায়দুর্গাপূজায় এই বাড়িতে বড় মহিষ বলি দেয়া হতোতখন বিভিন্ন এলাকা থেকে বহু মানুষের জমায়েত হতোবাড়িটিতে দীর্ঘ সময় ধরে উৎসব হতোসময়ের কালক্রমে জমিদারী প্রথার বিলুপ্তি হয়ভেঙ্গে পড়ছে জমিদারী বাড়িটিনেই সেই উৎসব। 

সন্ধ্যা হয়ে আসছিলোআমরা ফিরে আসছিপেছনে ফেলে আসছি ইতিহাস ঐতিহ্যর সেই স্মৃতিচিহ্নজমিদার বাড়ি, ঘোড়া হাতী আস্তাবল জলসা ঘরস্থানীয়দের দাবী, জমিদার ভৈরব চন্দ্র সিংহের বাড়িটি যেন সংরক্ষণকরা হয় ইতিহাস রক্ষার স্বার্থে 


কিভাবে যাবেন
কুমিল্লা বিশ্বরোড থেকে বাসে মাধাইয়ামাধাইয়া থেকে সিএনজিতে মহিচাইলআবার ঢাকা থেকে কুমিল্লার লোকাল বাসে চড়লে বিশ্বরোড পর্যন্ত আসার দরকার নেইসরাসরি মাধাইয়া নেমে গেলেই হবেমহিচাইল বাজার থেকে ৭-৮ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে জমিদার বাড়ি