ইতিহাসের এক সমৃদ্ধ জনপদ গাজীপুর। যার প্রাচীন নাম জয়দেবপুর। এ নগরীকে ঘিরে রচিত হয়েছে অনেক ইতিহাস। গাজীপুর ভাওয়াল রাজবাড়ির জন্য বিখ্যাত হলেও সুপ্রাচীন কাল থেকে এ জনপদ তার সমৃদ্ধ ইতিহাসের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছে। এ জেলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন যার অধিকাংশই আমাদের অজানা। বিভিন্ন সূত্র থেকে ধারণা করা হয় যে, প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে বঙ্গ জনপদের এ অঞ্চল মৌর্য্য সম্রাট আশোকের শাসনাধীন ছিল।
এ ধারণার কারন জয়দেবপুরে অবস্থিত সাকাশ্বর স্তম্ভ। প্রাচীনযুগ থেকেই এ অঞ্চলের ডবাক ডাকুরাই সাকেশ্বর প্রভূতি ক্ষুদ্র জনপদ পাল, দাস, চেদী ও চন্ডালদের দ্বারা শাসিত হয়। মুসলিম শাসনামলে এই জনপদগুলো ভাহওয়াল (ভাওয়াল) নামে সুবৃহৎ পরগনায় পরিণত হয়। ঐতিহাসিক তথ্য থেকে জানা যায় যে, খ্রিষ্টীয় নবম শতাব্দীর দিকে রাজা যশোপাল, শিশুপাল প্রতাপ ও মহেন্দ্ৰ ভাওয়ালের বিভিন্ন স্থানে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সামন্ত রাজ স্থাপন করেন। প্রচলিত কিংবদন্তি অনুসারে, এই ক্ষুদ্র সামন্ত রাজ্যগুলো চেদী রাজ্য নামে পরিচিত ছিল।
গাজীপুরে আজকে আমার দ্বিতীয় দিন। গতকাল কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে জয়দেবপুরগামী ট্রেনে চেপে বসেছিলাম গাজীপুরের উদ্দেশ্যে। প্লান ছিলো ২/৩ দিনে সমগ্র গাজীপুর জেলার অলিগলি ঘুরে বেড়াবো। যতো প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক নিদর্শন আছে সব খুঁজে বের করবো। সারাদিন ঘুরাঘুরি করে রাতটা কাটিয়েছি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে এক ছোট ভাইয়ের রুমমেট হয়ে। আজ খুব ভোরেই বের হয়ে পড়েছিলাম ইতিহাসের সন্ধ্যানে। শুরুতেই গন্তব্য ছিলো গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার শ্রীফলতলী জমিদার বাড়ি। সে গল্প আরেকদিন বলবো। আমাদের আজকের গল্পটি একটু ভিন্ন ধর্মী। শ্রীফলতলী জমিদার বাড়ি ঘুরে সকাল ১১ টা নাগাদ বেড়িয়ে পড়ি একই উপজেলার সাকাশ্বর গ্রামের উদ্দেশ্যে। যখনই শুনলাম যেখানে প্রাচীন একটি স্তম্ভের সন্ধ্যান পাওয়া গিয়েছে যা কিনা আড়াই হাজার বছর পুরানো মৌর্য্য সম্রাট অশোক নির্মিত স্তম্ভ বলে ধারণা করা হচ্ছে তখন আর নিজেকে সংবরণ করতে পারলাম না দ্রুতই কালিয়াকৈর বাস স্ট্যান্ড থেকে যাত্রা শুরু করলাম সাকাশ্বর গ্রামের উদ্দেশ্যে। কালিকৈর থেকে লোকাল বাসে চেপে প্রায় আধা ঘন্টার পথ অতিক্রম করলে নামলাম কোনাবাড়ি বাস স্ট্যান্ডে।
সেখান থেকে বাকি পথ যেতে হবে সিএনজি তে করে।কিন্তু সেখানেই বাধলো বিপত্তি। সিএনজি ড্রাইভারদের স্ট্রাইক চলার দরুন তারা কেউই যেতে রাজি হচ্ছিলো না। অতঃপর অনেক কষ্টে একটা সিনজি ভাড়া করে চলে গেলাম সাকাশ্বর বাজারে। আর যেনো তর সইছিলো না। বাজারে গিয়ে সাকাশ্বর স্তম্ভের কথা জিজ্ঞেস করতেই এক পথচারী রাস্তা দেখিয়ে দিলো। সাকাশ্বর স্তম্ভটি সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে এখানকার একটি প্রাচীন হিন্দু মন্দিরের ভিতরে। যা লোকমুখে সিদ্ধি মাধব নামে পরিচিত।
সাকাশ্বর বাজার থেকে ৫ মিনিট হাটার পরই আমরা মন্দিরটির সামনে পৌছে গেলাম। মন্দিরটির সামনে পৌছাতেই মন্দির ভিতরে স্তম্ভটি দেখতে পাচ্ছিলাম। কিন্তু মন্দিরটি ছিলো তালা মারা যার দরুন স্তম্ভটির প্রকৃত সৌন্দর্য্য উপলব্দি করতে পারছিলাম না। মন্দিরের পাশের কয়েকজন লোকের কাছ থেকে জানতে পারলাম এই মন্দিরের চাবি কাছে বিষু নামক এক স্থানীয় লোকের কাছে। অগত্যা বাধ্য হয়ে বিষুকে খুঁজে বের করার অভিযানে লেগে পড়লাম। কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পর স্থানীয় কয়েকজনের সহায়তায় বিষুর বাড়ির সন্ধানও পেয়ে গেলাম। তাকে এখানে আসার উদ্দেশ্য বর্ণনা করতেই খুব আগ্রহ নিয়ে উনি আমাকে মন্দিরে নিয়ে গেলেন তালা খুলে দেয়ার জন্য। তালা খুলে ভিতরে ঢুকতেই খুব কাছ থেকে স্তম্ভটি দেখতে পেলাম। লম্বায় প্রায় চার থেকে পাঁচ ফুট হবে পেছন দিকটা একটু হেলানো।
স্তম্ভটির গায়ে কিছু চিত্র অঙ্কিত ছিলে যা কালের আবর্তে অনেকটাই মুছে গিয়েছে। মৌর্য্য শাসনামলে মহামতি অশোক তার রাজ্যের সিমানায় ৮৪ হাজার স্তম্ভ নির্মাণ করেছিলাম তার মধ্যে সম্ভবত এই সাকাশ্বর গ্রামের এই স্তম্ভটিও একটি।
বলা হয়ে থাকে গৌতম বুদ্ধ স্বয়ং যে সমস্ত জায়গায় স্বশরীরে উপস্থিত ছিলেন সেই জায়গা গুলোতেই অশোক স্তম্ভ স্থাপন করা হয়েছিলো। সে হিসেবে সাকাশ্বর গ্রামের এই স্থানটিতে গৌতম বুদ্ধ কিছু সময়ের জন্য অবস্থান করেছিলেন সেটা বলাই যায়।
স্থানীয়দের কাছে এই স্তম্ভটি খুব
মান্যগণ্যের একটি বস্তু। স্থানীয় হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সবাই এই স্তম্ভটিতে এসে মান্নত
করেন নিজেদের মনোঃকামনা পূরণের জন্য।
সাকাশ্বর গ্রামের এই স্তম্ভটি নিঃসন্দেহে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্পদ। এটিকে সংগ্রহণ করতে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের হস্তক্ষেপ একান্তই কাম্য।
লেখক: Rafiq The Explorer