জমিদার বলতেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশাল বড় বাড়ি। অনেক পাইক পেয়াদা, খাজনা আদায়ের দৃশ্য। জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে ৩৫০০ জমিদার ছিলো। সব জমিদার যে ভালো ছিলো তা কিন্তু নয়। কিছু জমিদার ছিলো প্রচন্ড রকমের অত্যাচারি। আজকের গল্প তেমনি একজন অত্যাচারি জমিদারকে নিয়ে।
“উপরে এক ভগবান আর নিচে আমি এক ভগবান”, “তোদের ভগবান বলতে আমিই। আমি যা বলবো তোদের তাই করতে হবে। আমার হুকুমই শিরোধার্য।”এভাবেই নাকি বলতেন কুষ্টিয়ার প্রতাপশালী জমিদার ভগবানচন্দ্র শাহ্। কথাগুলো এখন শুনতে রূপকথার মতো লাগে।
শোনা যায়, একসময় এই জমিদারের বাড়ির সামনে দিয়ে মাথা উঁচু করে চলার সাহস ছিলো না কারো। সেই জমিদারের জমিদারিত্ব শেষ হলেও কালের স্বাক্ষী হয়ে পড়ে আছে সেই জমিদার বাড়িটি।
এত বড় জমিদারের এত বড় বাড়ি কিন্তু সেখানে জমিদারির কোনো আস্ফালন আজ আর নেই। ভগবানচন্দ্র শাহ্’র জমিদার বাড়িটি কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার আমলায় অবস্থিত।
বাড়িটি প্রায় ২০ বিঘা জমি নিয়ে তৈরি। বড় তিনটি উঠান, দিঘি ও বড় দ্বিতল ভবনের চারটি বিল্ডিংসহ মূল বাড়িটি তৈরী। এখান থেকেই জমিদারির কাজ পরিচালনা করতেন ভগবানচন্দ্র। জমিদার ভগবানচন্দ্র শাহ্ কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার আমলার জমিদার কালিপদ শাহ’র পুত্র। জমিদারের উত্তরাধিকার সূত্রে জমিদারি লাভ করেন ভগবানচন্দ্র শাহ্। চুনিলাল শাহ্, মকন্দ্র লাল শাহ্, ব্রজেন্দ্র লাল শাহ্, ভগবানচন্দ্র শাহ্, বিজয় কুমার শাহ্, ও বোন বিব্রনামলা দাশী এই ছয় ভাই বোনের মধ্যে জমিদারি দেখাশোনা করতেন ভগবানচন্দ্র শাহ্।
তার জমিদারি সম্পর্কে জানা যায়, ভগবানচন্দ্র শাহ্ ছিলেন তৎকালীন এই অঞ্চলের সব চাইতে প্রভাশালী, প্রতাপশালী জমিদার। তিনি গরীব প্রজাদের অনেক অত্যাচার করেছেন। বিশেষ করে মুসলমান প্রজাদের বেশি অত্যাচার করতেন। তিনি সর্বদা অনেক পাইক পেয়াদা এবং ঘোড়া নিয়ে চলাফেরা করতেন। তিনি প্রজাদের খাজনার জন্য অনেক চাপ সৃষ্টি করতেন। খাজনা না দিতে পারলে প্রজাদের বাড়িঘর বিক্রি করে দিতেন। জমিজমা নিজে দখল করে নিতেন।
জমিদার ভগবানচন্দ্র শাহ্ তার জমিদারির কাজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য তিনি বিভিন্ন এলাকায় মোট ১৭টি গোলাবাড়ি স্থাপন করেছিলেন। এক এক অঞ্চলের জমির খাজনা আদায় করে তিনি তার সেই অঞ্চলের স্থাপিত গোলাবাড়ীতে সংরক্ষণ করে রাখতেন। পরবর্তী সময়ে তিনি চড়া সুদে তার প্রজাদের সেগুলো ধার দিতেন। কেউ যদি সেটা ফেরত দিতে না পারতো তাকে পেয়াদা পাঠিয়ে ধরে জমিদার বাড়িতে নিয়ে আসা হতো। বিভিন্ন ভাবে তাদের নির্যাতন করা হতো। তিনি তাদের জায়গা জমি নিজের নামে লিখে নিতেন।
ভগবানচন্দ্র শাহ্ কিছু সুঠামদেহী বলশালী প্রজাকে নিয়ে ‘লালপেয়াদা’ নামের বিশাল এক বাহিনি গড়ে তোলেন। ভগবানচন্দ্র শাহ’র নির্দেশে বিভিন্ন এলাকায় তারা গরিব মুসলমান প্রজাদের অত্যাচার করে বেড়াতেন।
তৎকালীন জমিদার ভগবানচন্দ্র শাহ’র জমিদার বাড়ির সামনে দিয়ে মুসলমান প্রজারা যেতে সাহস পেতো না। এমনকি হিন্দু প্রজারাও মাথা উঁচু করে তার বাড়ির সামনে দিয়ে যেতে পারতো না। ঘোড়ায় চড়ে, জুতো বা খড়ম পায়ে দিয়ে, ছাতা মাথায় দিয়ে, নতুন জামা পরে, এমনকি বাড়ির সামনের দিকে মাথা তুলে তাকিয়ে যেতে পারতো না। এছাড়া জমিদার ভগবান চন্দ্র শাহ্ মাঝে মাঝে তার জমিদার বাড়িতে বাইজী নাচতেনও। জমিদার ভগবানচন্দ্র শাহ্ মুসলমান প্রজাদের প্রতি যে অত্যাচার করতেন তার একটি নমুনা হচ্ছে, মুসলমান প্রজাদের ছেলে মেয়েদের লেখা-পড়া না করার কথা বলতেন। তিনি বলতেন, তোদের লেখা-পড়া করে কাজ নেই, আমার গোলামি কর।
জনশ্রুতি আছে, জমিদার ভগবানচন্দ্র শাহ্ এক কোরবানির ঈদের দিন সকালে তার জমিদার বাড়ির শৌচাগারে বেঘোরে মারা যান। তার বংশধর অনেকে অন্য দেশে বসবাস করতো বলে তার মৃত্যুর চার দিন পরে তার মৃতদেহের সৎকার করা হয়।
জমিদার ভগবানচন্দ্র শাহ্ এলাকার গরিব প্রজাদের ওপর অনেক অত্যাচার করতেন বলে তার মৃত্যুর পরপরই তার বংশধরেরা জমিদারী প্রথা বিলীন হওয়ার আগেই জমিদারি ফেলে রেখে ভারতে চলে যায়।
জমিদার ভগবানচন্দ্র শাহ’র বাড়িটি বর্তমানে কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার আমলা বাজারের পাশে জমিদার ভগবানচন্দ্র শাহ’র স্মৃতিস্তম্ভ হয়ে পড়ে আছে। তার সকল সম্পত্তি স্থানীয় জনগণ জবর দখল করে বসবাস করছে।
তার ব্যবহৃত দিঘি, শৌচাগার, কলপাড়, রান্নাঘর আর কুয়ো এখনো কালের স্বাক্ষী হয়ে আছে। বাড়িটি বর্তমানে আমলা সরকারি ডিগ্রি কলেজের ছাত্রাবাস হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এক সময় যে জমিদারের এতো প্রভাব, প্রতাপ ছিলো, তার বড় জমিদার বাড়ির সামনের রাস্তাও এখন বন্ধ হয়ে গেছে। বাড়ির সামনের ফটক বন্ধ করে সরকার গড়ে তুলেছে আমলা পুলিশ ক্যাম্প।
বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা আসেন জমিদার ভগবানচন্দ্র শাহ’র জমিদার বাড়ি দেখতে। কিন্তু তার জমির ওপর অবৈধ স্থাপনা এবং ভোগদখলকারীদের প্রভাবে তার বাড়িতে ঢোকার কোনো ব্যবস্থাই আর নেই।
স্থানীয় প্রবীণ হাজারী লাল কর্মকার জানান, জমিদার ভগবানচন্দ্র শাহ’র উত্তরাধিকারীরা বিভিন্ন সময়ে এদেশে আসেন। জমিদার বাড়িটি বর্তমানে আমলা সরকারি ডিগ্রি কলেজের আওতাধীন রয়েছে। কিছুদিন আগেও বাড়িটি বাংলাদেশের অন্যতম নাট্য নির্মাতা ও চলচ্চিত্র পরিচালক অনিমেষ আইচের ‘না মানুষ’ চলচিত্রের শুটিংয়ের কাজে ব্যাবহৃত হয়।
কুষ্টিয়া সদর থেকে বাস কিংবা অটোতে করে আসতে হবে মীরপুর উপজেলায়। সেখান থেকে অটো কিংবা রিক্সায় করে খুব সহজেই চলে আসা যাবে জমিদার ভগবান চন্দ্রের বাড়িতে।



